খাবারের নাম লাদা দোম্বা। নামটা কেমন যেন শোনায় না? তবে চেখে দেখার পর যে আর নাম নিয়ে নাক সিটকাবেন না, তা হলফ করে বলতে পারি। খাবার পর নিজেকে মনে হবে শেকস্পিয়র। বলে উঠবেন, “নামে কি বা এসে যায়”?

আজ্ঞে হ্যাঁ, নামটা যতই উদ্ভট হোক না কেন লাদা দোম্বার স্বাদ একেবারে অনবদ্য। এটি একটি প্রাচ্য দেশীয় পদ। মূলত ইন্দোনেশিয়াতেই এই লাদা দোম্বা রান্নার চল বেশি। ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় লাদা শব্দের অর্থ ঝাল। তা সে লঙ্কা কিংবা গোলমরিচ দুইয়েরই হতে পারে। আর দোম্বা শব্দটি এসেছে দুম্বা থেকে। দুম্বা হল ভেড়া জাতীয় প্রাণী। ভারতে না হলেও প্রাচ্যের অন্যান্য দেশ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে দুম্বা দারুণ জনপ্রিয়। মানে বাংলা করলে লাদা দুম্বা হল ঝাল মাংস বা লঙ্কা দিয়ে রান্না করা মাংস।আজকাল ইন্টারনেটের কল্যাণে দেশ বিদেশের রান্নার রেসিপি কিংবা মশলাপাতি পেয়ে যাওয়া যায় খুব সহজ। কিন্তু কয়েক দশক আগেও বিদেশি রেসিপির হদিশ মিলত বই পড়ে বা খবরের কাগজ দেখে। তারও আগে সেসব রান্নার হদিশ মিলত বিদেশি পাচক কিংবা বিদেশ থেকে ঘুরে আসা পরিচিত খাদ্যরসিকদের কাছ থেকে। সে সময় বিদেশি রান্নার চল সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়িতে ছিল না বললেই চলে। মূলত বনেদি বাড়িগুলিতেই বিদেশি রান্নার প্রচলন শুরু হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির নাম বার বার উঠে আসে। তবে ঠাকুরবাড়ি ছাড়াও রাজ্যের বহু বনেদি বাড়িতে বিদেশি রান্না হত। তবে বিদেশি মশলাপাতির অভাবে দেশীয় মশলা দিয়ে বাঙালি মতে রান্না হত সেইসব পদ। এখনও হয়। উত্তরসূরীদের হাত ধরে সেইসব রান্না আজও প্রচলিত।

তখনকার দিনে নাকি কোনও বনেদি বাড়ির অনুষ্ঠানে এক না একটি স্পেশাল পদ রান্নার ফ্যাশন ছিল। না হলে নাকি অতিথিদের কাছে ঠিক মান থাকত না। এই কারণেই নানা স্পেশাল ডিশের আবিষ্কার হত সেই বাড়ির হেঁশেলে। এরকমই একটি রান্না হল ‘লাদা দোম্বা’। শোনা যায়, এই পদটি নাকি প্রথম রান্না হযেছিল নদিয়ার রাজবাড়িতে। আর সেখান থেকেই বাংলা জুড়ে তা জনপ্রিয়তা পায়। যে বছর আমাদের দেশ স্বাধীন হল, মানে ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে তৎকালীন রাজা সৌরিশচন্দ্র রায়ের আশীর্বাদের অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। সেই উপলক্ষে কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। খাবারের তালিকায় ছিল মাত্র ১৩৮টি পদ। এক একটি মেনু কার্ড তৈরি করতে দশটি পাতা খরচ হয়েছিল। সেই দশ পাতার মেনু কার্ডে দেশ-বিদেশের নানা পদ ঠাঁই পেয়েছিল। আর তার মধ্যে অন্যতম ছিল এই ‘লাদা দোম্বা’।

তবে হ্যাঁ, কন্টিনেন্টাল ডিশ হলেও তখন তো আর অনলাইনে অর্ডার করে মশলাপাতি মিলত না, তাই নিজের মতো করেই রাজবাড়ির পাচক লাদা দোম্বা তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীকালে সেই রান্নাই হয়ে ওঠে খাঁটি দেশীয় পদ। তবে এই পদটি রান্না করতে দুম্বার খোঁজ করতে হবে না। খাসির মাংস হলেই চলবে। মশলাপাতিও লাগবে নামমাত্র। এক্ষেত্রে ধৈর্য্য আর অধ্যাবসায়টাই বেশি জরুরি।

লাদা দোম্বার রেসিপি

লাদা দোম্বার রেসিপি

উপকরণ

  • খাসির মাংস- ১ কেজি
  • লাল লঙ্কা- ৮টা (ঝাল কম খেলে কম লঙ্কা দিন)
  • বীজ ছাড়া লাল লঙ্কা- ৮-১০টা (বীজ ছাড়ানো থাকলে ঝাল কমে যায়)
  • পেঁয়াজ- ২টো বড় সাইজের
  • রসুনের কোয়া- ২০টি
  • আদা বাটা- দেড় চা চামচ
  • ধনেপাতা- ১ আঁটি
  • গোলমরিচ- ১০-১২টা
  • নুন- স্বাদমতো
  • লেবুর রস- ২ চা চামচ
  • চিনি দেড় চা-চামচ
  • ঘি- ২ টেবিল চামচ
  • সর্ষের তেল- পরিমাণমতো
  • গরম জল- প্রয়োজনমতো

প্রণালী

  • মাংস খুব ভালো করে ধুয়ে নিন।
  • পেঁয়াজ ঝিরিঝিরি করে কেটে রাখুন।
  • ধনে পাতা, রসুনের কোয়া, লাল লঙ্কা, আদা বাটা, গোলমরিচ, এক চামচ নুন, ৩ চামচ সর্ষের তেল এবং আধ কাপ জল নিয়ে মিহি করে বেটে নিন।
  • এবার এই মিশ্রণটি দিয়ে মাংস ভালো করে মেখে ম্যারিনেট করতে হবে। অন্তত দুই ঘণ্টা ম্যারিনেট করে রাখুন।
  • কড়াইয়ে তেল এবং ঘি গরম করে তাতে পেঁয়াজ কুচি দিন।
  • পেঁয়াজ লাল করে ভাজতে হবে। তবে খেয়াল রাখবেন পুড়ে যেন না যায়।
  • এবার এতে দিয়ে দিন ম্যারিনেট করা মাংস। ভালো করে মিশিয়ে নিন। খুব ভালো করে কষাতে হবে।
  • এবার এতে সামান্য গরম জল দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। এতে একটু নুন এবং বীজ বের করে রাখা লাল কাঁচালঙ্কাগুলি দিয়ে দিন।
  • ফের ভালো করে কষান।
  • পুরো রান্নাটা কড়াইয়ে করলে অনেকটা সময় লাগবে। হাতে সময় না থাকলে প্রেশার কুকারে কড়াইয়ের মাংস সরিয়ে নিন।
  • এতে আলাদা করে জল দিতে হয় না। মাংসের ছাড়া জল দিয়েই রান্না হয়ে যায়।
  • পেশার কুকারে কয়েকটি সিটি দিয়ে নিন।
  • প্রেশার কুকারের ভাপ একেবারে বেরিয়ে গেলে ঢাকনা খুলে নিন। এবার এতে দিয়ে দিন চিনি। তারপর ভালো করে মেশান।
  • চিনি মিশে গেলে তাতে ছড়িয়ে দিন লেবুর রস। অল্প নেড়ে আঁচ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ঢাকা দিয়ে রাখুন।
  • ঝাল, নুন কিংবা চিনির পরিমাণ নিজের রুচি মতো দেবেন।
  • লাদা দোম্বা খেতে ভালো লাগবে সাদা ভাত দিয়ে। তবে উচ্ছা হলে রুটি, পরোটা বা পোলাওয়ের সঙ্গেও লাদা দোম্বা পরিবেশন করতে পারেন।

TRAVONEWS BANGLA সবার আগে পড়ুন ব্রেকিং নিউজ। থাকছে দৈনিক টাটকা খবর, খবরের লাইভ আপডেট। সবচেয়ে ভরসাযোগ্য বাংলা খবর পড়ুন TRAVONEWS.IN বাংলার ওয়েবসাইটে

-Travo News

for More

Like, Subscribe and Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights