পুরীর মন্দিরে জগন্নাথ দর্শনের পর আর কিছু কেনা হোক না হোক, কেজি খানেক ফেনী কেনা হয়েই থাকে। ফেনী বুঝলেন না? আরে বাবা সাদা বাংলায় যাকে বলে খাজা। ওড়িশায় এই খাজাকেই বলা হয় ফেনী। নিজেরা তো খাবেনই, পরিবার বন্ধুবান্ধবদের জন্যও সকলে এই ফেনী বা খাজা নিয়ে যান। বাঙালি পর্যটক-দর্শনার্থীদের কাছে এ যেন এক অলিখিত নিয়ম। জগন্নাথ দেবের প্রিয় এই খাজা আট থেকে আশি সকলেরই প্রিয়। অথচ জানেন কি এই খাজা বা ফেনী কিন্তু আদৌ ওড়িশার খাবার নয়? এর উৎপত্তি মা সীতার বাড়ির কাছে। তাহলে এবার খুলে বলা যাক।

ইতিহাসবিদদের মতে, মৌর্য সাম্রাজ্যের একেবারে গোড়ার দিকে মিথিলা এবং নালন্দার মাঝে অবস্থিত শিলাও নামে একটি গ্রামে খাজা-র উদ্ভব হয়। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, এই শুকনো খাজা ছিল রাজখাদ্য। আবার কিছু ইতিহাসবিদদের মতে, খাজার উৎপত্তি হয়েছিল অন্ধ্রপ্রদেশে। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর ‘সি-ইউ-কি’ গ্রন্থে এই খাজার বর্ণনা রয়েছে। তিনি এই খাজার সঙ্গে তুলনা করেন তুরস্কের ‘বাকলাভ’-র। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চালুক্য রাজ তৃতীয় সোমেশ্বরের ‘মানসোল্লাস’ গ্রন্থে খজার উল্লেখ আছে। পুরীর খাজার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল পাওয়া যায় শিলাও-এর খাজার।

এই খাজা নাকি জগন্নাথ দেবের মন্দিরে প্রবেশ করেছিল এক মুসলমান হালুইকরের হাত দিয়ে। কথিত আছে, এক মুসলমান হালুইকারের শখ হয় নিজের হাতে তৈরি খাজা জগন্নাথ দেবকে নিবেদন করবেন। কিন্তু ধর্মীয় বৈষ্যম্যের কারণে সে তো সম্ভব ছিল না। এদিকে প্রভু জগন্নাথ স্বয়ং তাঁকে খাজা বানানোর স্বপ্নাদেশ দেন। এবং সন্ধের আগে তা মন্দিরে নিয়ে যেতে বলেন। প্রভুর কথামতো সেই হালুইকর খাজা বানিয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে গেলে রক্ষী এবং পুরোহিতরা তাঁকে বাধা দেন। আর সন্ধ্যার মুখে আচমকা একটি কালো রঙের কুকুর ঝাঁপিয়ে সেই খাজা মুখে নিয়ে দৌড়ে মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করে। ঝগড়া থামিয়ে সবাই কুকুরটিকে ধাওয়া করেন। কিন্তু ততক্ষণে কুকুর অদৃশ্য। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এদিকে অদ্ভুতভাবে সেই খাজা অর্ধভুক্ত অবস্থায় জগন্নাথ মূর্তির সামনে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এবং তখনই নাকি গর্ভগৃহ থেকে প্রভুর দৈববাণী শোনা যায় যে, তাঁর এই খাজা খাওয়ার ইচ্ছে হয়ছিল। কিন্তু তাতে বাধা পেয়ে তিনি নিজেই কুকুর রূপ ধারণ করে তা গ্রহণ করেছেন। প্রভু নির্দেশ দেন যে, এরপর থেকে যেন প্রতি সন্ধ্যায় এই খাজা তাঁকে ভোগ দেওয়া হয়। সেই থেকে খাজার জনপ্রিয়তা শুরু। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টায় বড়সিঙ্গার ধূপে এই খাজা বা ফেনী জগন্নাথ দেবকে নিবেদন করা হয়।

খাজার রেসিপি

উপকরণ
  • ময়দা- ২ কাপ
  • ঘি- ৪ টেবিল চামচ
  • সাদা তেল- ভাজার জন্য
  • চিনি- ২ কাপ
  • জল- ১/২ কাপ

প্রণালী

  • ময়দা এবং ঘি ভালো করে ময়ান দিতে হবে। ময়ান যত ভালো হবে খাজা তত খাস্তা হবে। সাত আট মিনিট ধরে ময়দা ময়ান দিন। হাতে মুঠো করে ময়দা ধরতে পারলে বুঝবেন ময়ান ভালো হয়েছে।
  • এবার ডো বানাতে হবে। খাজা তৈরির ডো একটু শক্ত করে মাখতে হয়। সেক্ষেত্রে একবারে জল না দিয়ে, অল্প অল্প করে জল দিয়ে ময়দা মাখুন। খেয়াল রাখবেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত জল যেন একেবারই না পড়ে।
  • ভালো মতো ময়দা মেখে কিছুক্ষণ ঢাকনা দিয়ে রাখুন। ততক্ষণে চিনির সিরা তৈরি করে নিন।
  • কড়াইয়ে দুই কাপ চিনি এবং অর্ধেক কাপ জল নিয়ে গরম করুন। জল ফুটতে শুরু করলে চিনিও ধীরে ধীরে গলে জলের সঙ্গে মিশে যাবে। হাতা দিয়ে চিনি নাড়তে থাকুন। রস চিটচিটে হলে গ্যাসের ফ্লেম বন্ধ করে চিনির সিরা ঠান্ডা করতে দিন।
  • এবার আসল কাজ। দুই কাপ ময়দায় সাত থেকে আটটি লেচি কাটা যাবে।
  • লেচি একেবারে পাতলা করে বেলতে হবে। রুটির সাইজের থেকে একটু বড় হবে এবং অত্যন্ত পাতলা হবে।
  • অত্যাধিক পাতলা রুটি বেলাটা সম্পূর্ণ নিজের কৌশল এবং নৈপুণ্যতার উপর নির্ভর করছে। রুটি একটুও ছিঁড়ে গেলে চলবে না। এবং প্রতিটি রুটির আকার মোটামুটি একই রকম হতে হবে। রুটি বেলার সময় ময়দার পরিবর্তে কর্নফ্লাওয়ার ব্যবহার করুন।
  • এবার একটা রুটির উপর ভালো করে ঘি মাখিয়ে তার উপর কর্নফ্লাওয়ার ছড়িয়ে দিন। এবার একটির উপরে আরেকটি রুটি রাখুন এবং একইভাবে ঘি মাখিয়ে কর্নফ্লাওয়ার ছড়িয়ে দিন। এভাবে চারটি রুটির লেয়ার তৈরি করতে হবে।
  • চারটি রুটির লেয়ারকে এবার রোল করার পালা। হাতের কারসাজিতে রুটির লেয়ারকে সরু করে রোল করতে হবে। একদম শেষে সামান্য জল দিয়ে রুটি আটকে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে আঙুলে জল নিয়ে আঠার মতো রুটির ধারে মাখিয়ে নিন। তাহলে ভাজার সময় রুটির লেয়ার খুলে যাবে না।
  • এবার এই রোল ছুরি দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে নিন। এক ইঞ্চ মতো লম্বা করে কাটতে হবে। হাতের তালু দিয়ে আলতো করে চেপে লম্বালম্বি করে নিন।
  • লম্বালম্বি লেয়ার পড়া লেচিগুলি হালকা হাতে বেলে নিন। শুধু দুইবার এপিঠ ওপিঠ একটু বেলে নিতে হবে। ভুলেও গায়ের জোরে এই কাজ করবেন না।
  • এবার কড়াইয়ে তেল বা গাওয়া ঘি গরম করুন। মিডিয়াম ফ্লেমে ঘি বা তেল গরম হলে তাতে খাজাগুলি সাবধানে দিয়ে দিন। এক একবারে চারটের বেশি খাঁজা ভাজবেন না।
  • খাজাগুলি লালচে করে ভেজে তুলে নিন। ভাজতে গিয়ে যদি লেয়ার খুলে যায় তাহলে চিন্তার কিছু নেই। এরকম হতেই পারে। ভাজার পর মোটামুটি দেখতে ঠিকই লাগবে।
  • খাজা একটু ঠান্ডা করে রসে দিয়ে তুলে নিলেই তৈরি সুস্বাদু মুচমুচে খাজা।
  • জগন্নাথ দেবকে ভোগ দেওয়ার পরও অনেকগুলি খাজা বেঁচে যাবে। সেগুলি কৌটোতে তুলে রাখুন। কয়েকদিন ধরে মজা করে খান।

TRAVONEWS BANGLA সবার আগে পড়ুন ব্রেকিং নিউজ। থাকছে দৈনিক টাটকা খবর, খবরের লাইভ আপডেট। সবচেয়ে ভরসাযোগ্য বাংলা খবর পড়ুন TRAVONEWS.IN বাংলার ওয়েবসাইটে

-Travo News

for More

Like, Subscribe and Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights